অর্থনীতি

ডলার নিয়ে উভয়সংকট

আন্তর্জাতিক মুদ্রা মার্কিন ডলার নিয়ে উভয়সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। কারণ, ডলার দিয়ে মেটাতে হয় সব ধরনের আমদানি দায়। আর ডলার আয় হয় মূলত রপ্তানি ও প্রবাসী আয় দিয়ে। তবে ডলার যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে ব্যয় মিটছে না। এতে বেড়ে গেছে ডলারের দাম।

যার প্রভাব পড়েছে আমদানিসহ সব ধরনের পণ্যের দামে। গত এক দশকে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়নি বাংলাদেশকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের দর পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়েও দিতে পারছে না, আবার মূল্যমান ধরেও রাখতে পারছে না।

প্রশ্ন উঠেছে মুদ্রার মান নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি ও কৌশল নিয়ে। কারণ, টাকার মান ধরে রাখতে গিয়ে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এতে কমে গেছে বৈধ পথে প্রবাসী আয়। অবশেষে কৌশল বদলে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ডলারের দাম নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এতে আরও কমে যায় প্রবাসী আয়। ফলে চার দিনের মাথায় ডলারের দাম নির্ধারণ থেকে পিছু হটে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার মানও কমিয়ে দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে টাকার মান কমানো হয়েছে আটবার।ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যেভাবে অর্থ মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিয়ন্ত্রণ করছে, ঠিক একইভাবে ডলারের দাম ও নীতিকৌশলও ঠিক করে দিচ্ছে। এর ফলে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। আর টাকার মান নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথেষ্ট গবেষণাও নেই। ফলে টাকার মান ধরে রেখে আরও বিপদ ডেকে আনা হয়েছে।

এনসিসি ও মেঘনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল আমিন এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, অর্থনীতিতে ডলারের দাম নির্ধারণ করে সুবিধা করা যায় না।

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ডলারকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। তবে যাতে বেশি বেড়ে বা কমে না যায়, এ জন্য তদারকি জোরদার করতে হবে। আর অর্থনৈতিক বিষয় রাজনৈতিক বা অন্য কোনো চাপে নির্ধারণ না করাই শ্রেয়। এর ফল ভালো হয় না। যার প্রমাণ এখন পাওয়া যাচ্ছে  ।                                                                                        

ডলারের দাম সময়মতো সমন্বয় না করে ভুল পথে হেঁটেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর সংকট শুরু হলে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে এসব সিদ্ধান্ত অল্প দিনে বাতিলও হয়ে যায়। গত ২৪ মে ব্যাংকগুলোর এমডিদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, কোনো কোনো ব্যাংক অযৌক্তিকভাবে ঘোষিত বিল সেটিং বা বিসিতে বিক্রি দরের চেয়ে অযৌক্তিকভাবে বেশি দামে বিদেশের এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে ডলার কিনছে।

এর ফলে বিদেশি মুদ্রাবাজারের বিনিময় হারে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। এ জন্য ঘোষিত দামে ডলার কেনার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হলো। পাশাপাশি দৈনিক কী পরিমাণ ডলার কী দামে আনা হচ্ছে, তার তথ্য জমা দিতে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ওই সময়ে ডলারের ঘোষিত দাম ছিল ৮৮ টাকা। কিন্তু ব্যাংকগুলো প্রবাসী আয় আনছিল সর্বোচ্চ ৯৫ টাকায়। এর চেয়ে বেশি দামে আমদানিকারকদের কাছে বিক্রি করছিল। ফলে ওই সিদ্ধান্ত পরের দিনই বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এরপর গত ২৯ মে ডলারের দাম নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ৮৯ টাকা ২০ পয়সা দাম নির্ধারণ করায় কমে যায় প্রবাসী আয়। অতিরিক্ত দামের আশায় রপ্তানিকারকেরাও বিল নগদায়ন বন্ধ করে দেন। এতে ব্যাংকগুলোতে সংকট প্রকট হয়ে ওঠে।

পরিস্থিতি এমন হয়, কয়েকটি ব্যাংক আমদানি দায় শোধ করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার পায়নি, অন্য ব্যাংক থেকেও কিনতে পারেনি। অনেক ব্যাংক আমদানি বিল পরিশোধে বিদেশি ব্যাংকের কাছে বাড়তি সময় নিয়েছে। এতে দেশীয় ব্যাংকগুলোর রেটিং ঝুঁকিতে পড়ার সম্মুখীন হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার প্রবাসী আয় আনতে ডলারের দামের সীমা তুলে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে জানিয়ে দেওয়া হয়, বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে ব্যাংকগুলো নিজেরাই ডলারের দাম নির্ধারণ করতে পারবে।

তবে হঠাৎ যেন ডলারের দাম বেশি বাড়িয়ে না ফেলা হয়, সেদিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। পাশাপাশি বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো যাতে দাম বেশি বাড়াতে না পারে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে। একই দিন ডলারের দাম ৯০ পয়সা বাড়িয়ে ৮৯ টাকা ৯০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। ফলে বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে ডলারের সংকট যেন আরও প্রকট হয়েছে। আর ব্যাংকগুলোর কাছে গেছে ভুল বার্তা।

এদিকে সীমা তুলে দেওয়ার পর গতকাল রোববার বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৯৪ টাকা দরে প্রবাসী আয় সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। মালয়েশিয়ার কয়েকটি এক্সচেঞ্জ হাউস জানিয়েছে, প্রবাসী আয়ে সোনালী ব্যাংক ৯১ টাকা, জনতা ব্যাংক ৯২ টাকা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক ৯৩ টাকা দর দিয়েছে। তবে গতকাল নিউইয়র্কে ব্যাংকগুলো বন্ধ থাকায় ডলারের লেনদেন সম্পন্ন হয়নি। ফলে ব্যাংকগুলো কত দামে প্রতি ডলার কিনেছে, জানা যায়নি।

সাবেক ব্যাংকার ও মুদ্রাবাজার বিশেষজ্ঞ মামুন রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, যে দামে ঋণপত্রের দাম সমন্বয় হচ্ছে, সেই দামকে প্রকৃত দর হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে। আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে ডলারের দাম সমন্বয় করতে হবে।

পাশাপাশি আমদানি পণ্যের দামও সমন্বয় করতে হবে। আমদানিকারকেরা যাতে ঋণপত্র খুলতে স্বস্তি বোধ করে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে যাতে জনগণের ভোগান্তি না হয়, না নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই সংকট কেটে যাবে।

মতামত দিন