বাংলাদেশ

অনাগত সন্তানের মুখ দেখা হলো না ইব্রাহিমের

ভোরের আলো ফোটার আগেই বাড়ির উঠানের সামনে এসে থামল দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ইব্রাহিম হোসাইনের লাশবাহী গাড়ি। ভোরের নীরবতা ভেঙে তখন সারা বাড়িতে কান্নার শব্দ। ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর বাঁধভাঙা কান্নায় গ্রামের বাতাস তখন ভারী হয়ে উঠছে। আজ সোমবার ভোরে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার নরসিংহপুর গ্রামে এমন দৃশ্য দেখেছে কয়েক শ মানুষ।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন এই গ্রামের আবুল কাশেম মুন্সীর ছেলে ইব্রাহিম হোসাইন। আজ ভোরে ফজরের নামাজের সময় মসজিদের মাইকে ইব্রাহিমের জানাজার ঘোষণা দেওয়া হয়। জানাজা শেষে সকাল নয়টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে ইব্রাহিমের লাশ দাফন সম্পন্ন হয়।

ইব্রাহিম প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের এক্সপোর্ট ডিপার্টমেন্টের শিপিং সহকারী পদে চাকরি করতেন। একই প্রতিষ্ঠানের অন্য শাখায় কাজ করেন তাঁর খালাতো ভাই নাজমুল হোসেন। তিনিই লাশ নিয়ে বাড়িতে আসেন।

ইব্রাহিমের ভাই নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের খবর দেখে আমরা গতকাল সকাল থেকেই ইব্রাহিমের মুঠোফোনে বারবার ফোন দিই, কিন্তু কেউ ফোন ধরেনি। অবশেষে দুপুর ১২টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মী ফোন ধরে জানান, এই ফোনের মালিক দগ্ধ হয়ে মারা গেছে। পরে খালাতো ভাইকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে ইব্রাহিমের লাশ শনাক্ত করা হয়।’

আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া ইব্রাহিমের মৃত্যুর খবরে গতকাল থেকেই প্রতিবেশী ও আশপাশের কয়েক গ্রামের লোকজন তাঁদের বাড়িতে ভিড় করছেন। বছর দেড়েক আগে পার্শ্ববর্তী হলিহট্ট গ্রামের মুন্নি খাতুনকে বিয়ে করেন ইব্রাহিম। তাঁদের সুখের সংসার। মুন্নি খাতুন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আগামী ২৮ জুলাই সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাব্য দিন ছিল।

ফ্রিজিং গাড়িতে সাদা প্যাকেটে মোড়ানো ইব্রাহিমের লাশ দূর থেকে একনজর দেখেছেন মুন্নি। জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে মুন্নি খাতুন যেন বাক্‌রুদ্ধ হয়ে গেছেন। বারবার মূর্ছা যেতে যেতে মুন্নি খাতুন বলেন, ‘আমার পাখিরে রেখে কীভাবে বাঁচব। আমাদের সন্তানরে নিয়ে ওর কত স্বপ্ন ছিল। এখন কী হবে!’

ইব্রাহিমের ভাই নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মুন্নির বাবার বাড়ি থেকে তাকে নিতে লোকজন এসেছিলেন। কিন্তু ইব্রাহিমের গতকাল বাড়ি আসার কথা ছিল, এ কারণে মুন্নি আর যায়নি। রোববার সকালে খবর আসে ইব্রাহিম আর নেই। অনাগত সন্তানের মুখ না দেখেই আমার ভাইটা চলে গেল।’

সন্তানের শোকে বারবার মূর্ছা যেতে থাকেন মা দুলাপি বেগম। পাশেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন বাবা অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসাশিক্ষক আবুল কাশেম।

মতামত দিন